শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন

নৌকা ডুবাতে মাঠে স্থানীয় এমপি!

পটুয়াখালী প্রতিনিধি
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে কাজ করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান মুহিব-এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এ অভিযোগ করেন। তারা বলেন- নৌকা প্রতীক নিয়ে যিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছে তিনিই এখন আবার নৌকার বিপক্ষে কৌশলে কাজ করছেন। যেমন-নৌকার পক্ষে প্রকাশ্যে আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের যত নেতাকর্মী তফসিল ঘোষনার পর মাঠে কাজ করেছেন তাদেরকে এমপি গত ১০-১২দিন যাবৎ বিভিন্ন চরে এবং একাধিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তার সফরসঙ্গি করে রেখেছেন। যাতে ওই সব নেতাকর্মীরা গনসংযোগ কিংবা নৌকার পক্ষে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা না করতে পারেন। অভিযোগ আছে-গত পাচ দিন আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আক্কারুজ্জামান কোক্কা মিয়ার ধুলারসর এলাকার নিজ বাড়ীতে তার সাথে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন এমপি মহিবুর রহমান। যা প্রত্যক্ষ করেছে ওই বাড়ীর সামনে কয়েকশ নেতাকর্মী। এসব অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে এমপির সফরসূচীসহ অনেকের বক্তব্যেও।
ভূক্তভোগিরা জানান, উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক আঃ মালেক আকন, টিয়াখালী ইউনিয়নের নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী চেয়ারম্যান ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি সৈয়দ মশিউর রহমান শিমু, টিয়াখালী ১নং ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ বশির, টিয়াখালী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার ছোবাহানসহ স্থানীয় আওয়ামীলীগের আরো একাধিক পদ পদবি ধারী নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে নৌকার বিপক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ত্যাগী নেতাকর্মীরা জানান, এমপি সাহেব সুপরিকল্পিত ভাবে নৌকার বিপক্ষে এদেরকে মাঠে নামিয়েছেন। পাশাপাশি নৌকার পরাজয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্নভাবে কুটকৌশল অবলম্বন করছেন। ভূক্তভোগিরা জানান, “এখন যদি আমি আমার নাম পত্রিকায় প্রকাশ পায় পরের দিন আমার বাসা বাড়ীতে হামলা হবে মিথ্যা মামলা হবে। তখন আপনাদের (সাংবাদিকদের) খুজে পাওয়া যাবেনা। যে কারণে দয়া করে আমাদের নামগুলো প্রকাশ করবেননা।”
এমপির পরিকল্পিত কুটকৌশলের উদাহরণ হিসাবে ভূক্তভোগিরা জানান, কলাপাড়া সমিতির ব্যানারে আগামী ২৯মার্চ বিকাল ৩টায় ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে কলাপাড়াকে জেলা করার দাবীতে মানববন্ধন এবং বিকাল ৪টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত মানববন্ধন ও আলোচনা সভায় কলাপাড়া রাঙ্গাবালী ও মহিপুর থানার এবং কুয়াকাটা পৌরসভাসহ সকল ইউনিয়নের জনগনকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, কলাপাড়া জেলা চাই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন অধ্যক্ষ মোঃ মহিবুর রহমান এমপি। এসব কিছু ব্যানারে লেখা থাকলেও গোপনে এমপি সাহেব সিনিয়র নেতৃবৃবন্দদের ২৯মার্চ ঢাকায় অবস্থানের জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছেন বলেও অনেকে স্বীকার করেন।
এদিকে খোজ নিয়ে জানা গেছে, ২৯মার্চের ওই অনুষ্ঠানে কলাপাড়া উপজেলার সকল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং সেক্রেটারীসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দদের উপস্থিত থাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন এমপি নিজে। আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দরা জানান, ৩১মার্চ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পদপদবিধারী সিনিয়র নেতারা যাতে কেউ নৌকার পক্ষে কাজ করতে না পারে সেই লক্ষ্যে কৌশলে এমপি নিজে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। যেটি বিষ্ময়করও বটে।
অপরদিকে এমপির ব্যক্তিগত সহকারী মোঃ তরিকুল ইসলাম মৃধার ১৩মার্চ তারিখের স্বাক্ষরিত এক সফরসূচীতে দেখা গেছে যে, কলাপাড়া আসনের সংসদ সদস্য মহিবুর রহমান গত ১৩মার্চ থেকে ২৬মার্চ পর্যন্ত কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী ও মহিপুর থানার বিভিন্ন কর্মসুচীতে অংশগ্রহন করেছেন। এরমধ্যে ১৩মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামীলীগ অফিসে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত। এছাড়া ১৩তারিখ থেকে ২৬তারিখ পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিন একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংবর্ধনা অনুষ্টানে প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রেখেছেন এমপি। এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল দলীয় নেতাকর্মীদের আকার ইঙ্গিতে নৌকার বিপক্ষে কাজ করার জন্য উৎসাহ যুগিয়েছেন বলে ভুক্তভোগিরা অভিযোগ করেন।
যদিও এমপির কাছের লোকজনদের দাবী, ২৬মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে এই সফরের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু সফরসূচীতে ২৬মার্চের কোন অনুষ্টানে যোগ দেয়ার কথা উল্লেখ নাই। সফরসূচীতে ২৬মার্চ রাত ৮টায় কলাপাড়া মমতা রাইসমিল মাঠে আয়োজিত ওয়াজ মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদানের কথা উল্লেখ রয়েছে। আবার এর আগের দিন ২৫মার্চ সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসুচী পালন করলেও এমপির সফরসূচীতে রয়েছে ওই দিন বিকাল ৩টায় মহিপুর থানা আওয়ামীলীগ ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের উদ্যোগে আয়োজিত মহিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান।
অবশ্য এমপির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এগুলো মিথ্যা অভিযোগ। ১৩ তারিখ থেকে আমি কয়েকটি স্কুলে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি মাত্র। তাছাড়া নৌকার পক্ষে সকল ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের ঝাপিয়ে পরতে বলিছি। তিনি বলেন, গতকাল বিকালেও কলাপাড়া দলীয় অফিসের দোতলায় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে রুদ্ধতর বৈঠক করিছি , সেখানেও সবাইকে বলিছি নৌকার পক্ষে কাজ করতে।
এ ব্যাপারে কিছু বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন নৌকা মার্কার প্রার্থী সাবেক পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এস এম রাকিবুল আহসান। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ করলে সবই পাওয়া যাবে।
উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক আঃ মালেক আকন জানান, আমার বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ সম্পূর্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। স্থানীয় একটি স্বার্থান্নেসি মহল এসব মিথ্যা রটনা ছড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আমি ও আমার পরিবার জন্ম সূত্রে আওয়ামীলীগ।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে টিয়াখালী ইউনিয়নের নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী চেয়ারম্যান ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি সৈয়দ মশিউর রহমান শিমু বলেন, নৌকার বিপক্ষে কাজ করছিনা যেহেতু আওয়ামীলীগ ছাড়া বিকল্প কোন দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেনা সে কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী সেও আওয়ামীলীগের। এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে মাঠে কাজ করার ব্যাপারে কোন বিধিনিষেধ কেন্দ্র থেকে দেয়নি সেহেতু আমি ত্যাগী নেতার পক্ষে কাজ করছি।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার আঃ রশিদ জানান, বিষয়টি আমাদের কেউ অবগত করেনি। যে কারণে আমরা কিছুই জানিনা।
কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সহকারী রিটানির্ং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহি অফিসার মোঃ তানভির আহমেদ জানান, এমপি সাহেব কলাপাড়া ছিলেন এটি আমরা জানি। পাশাপাশি তিনি কয়েকটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন সেটাও আমরা জানি তবে তিনি কোথাও ভোট প্রার্থনা করেছেন এরকম কোন অভিযোগ আমাদের কাছে কেউ দেয়নি। আর যদি তিনি (এমপি) ভোট চেয়ে থাকেন তবে সেটা অবশ্যই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2019 payra24.com
Design & Developed BY payra24.com